শিকড় সন্ধানে ডেস্ক: এমন মানুষ যে আছে যেখানে, যে পরিবেশে, যে সাহচর্যে সে বাস করে- তার শেকড় সেখানে নয়, অন্যখানে। তখন এক শূূন্যতাবোধ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তেমনই এক নারী আনোয়ারা বেগম। আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৭৮ সালে ৫ বছর বয়সে টঙ্গীর কাছাকাছি একটি মাতৃসদন থেকে দত্তক হিসেবে নেদারল্যান্ডস্‌ে নিয়ে যাওয়া আনোয়ারা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শেকড়ের টান অনুভব করতে থাকেন এবং বাবা-মা-ভাই-বোনের মায়ার বন্ধনে বারবার ছুটে আসেন বাংলাদেশে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান তিনি। আশাহত আনোয়ারা ক্রমেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে। পত্রপত্রিকা, অনলাইনসহ নানান মাধ্যম ও বহু প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর খোঁজাখুঁজি শেষেও আনোয়ারা তার পরিবারকে না পেয়ে নানা সূত্র থেকে জানতে পারেন তাকে সহযোগিতা করতে পারে একমাত্র ‘ইত্যাদি’। দেরি না করে আনোয়ারা যোগাযোগ করেন ‘ইত্যাদি’ পরিবারের সঙ্গে। ইত্যাদির গত ৩০শে মার্চ প্রচারিত পর্বে আনোয়ারার হারিয়ে যাওয়ার কাহিনীসহ একটি সাক্ষাৎকার প্রচারের পর শেকড় খুঁজে পাওয়ার জন্য তার আকুতি দেখে অনেক দর্শকই অশ্রুসিক্ত হন। আবেগাপ্লুত দর্শকদের অনেকেই উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠেন, আনোয়ারা কি সত্যিই তার পরিবারকে খুঁজে পাবেন? কিন্তু কি আশ্চর্য, আনোয়ারা যেখানে বহুবার এ দেশে এসে, বহু মাধ্যমের সাহায্য নিয়েও তার বাবা-মাকে খুঁজে পাননি- সেখানে ‘ইত্যাদি’ প্রচারের পরদিন আনোয়ারার হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের খোঁজ দিয়ে ফোন আসে ইত্যাদির ঠিকানায়। একটিমাত্র অনুষ্ঠান সারা দেশে কি পরিমাণ আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে তার বড় প্রমাণ ‘ইত্যাদি’। নিজ গ্রামে নিজ বাড়ির উঠোনে ভাইবোনদের সঙ্গে আনোয়ারার প্রথম দেখার সেই মুহূর্ত এতটাই আবেগপূর্ণ যে কেউ কারো মুখের ভাষা না বুঝলেও আবেগের ভাষায় যেন বলা হয়ে গেল সব। এদিকে এবারের ইত্যাদিতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে মঞ্চে ডেকে এনে হানিফ সংকেত তাকে যেসব প্রশ্ন করলেন এবং আসাদুজ্জামান নূর যেভাবে জবাব দিলেন তা এক কথায় উপভোগ্য, শিক্ষণীয় ও আমাদের সংস্কৃতির জন্য সুখময় বার্তা। ধন্যবাদ আসাদুজ্জামান নূর, ধন্যবাদ  হানিফ সংকেত। এবারের অনুষ্ঠানে নীলফামারীর প্রতিবেদন, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার গ্রাম, বাড়ি এবং তার বন্দিশালা রোবেন আইল্যান্ডের ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নীলফামারীর শ্রমজীবী মানুষদের হাতে তৈরি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পণ্যসামগ্রী নির্মাণের বিস্ময়কর কাহিনী, নীলগাছ-নীলচাষ আর নীলকরদের অত্যাচার, ভাওয়াইয়া সংগীত সম্রাট আব্বাসউদ্দিন, নীলসাগর, চিনি মসজিদ, রেলওয়ে কারখানার ওপর তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন সবকটিতেই ছিল মেধা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং যথারীতি পরিশ্রমের ছাপ। এছাড়া ছিল সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ঝাঁঝালো সব নাট্যাংশ। সুলিখিত ও সু-অভিনিত। অনুষ্ঠান শেষে আনোয়ারাকে নিয়েই হানিফ সংকেত বলেন, আমরা যখন প্রায়ই দেখছি, পারিবারিক বন্ধনগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, নাগরিক জীবনে দেখা যায় একরাশ কষ্ট নিয়ে অনেক বাবা-মায়ের স্থান হচ্ছে বয়স্ক নিবাসে। এই সামাজিক চিত্রের বিপরীতে আনোয়ারা প্রমাণ করলেন দেশের মাটি, আপন জন ও রক্তের বাঁধন আসলে ছিন্ন হওয়ার নয়। আনোয়ারার মাধ্যমে হানিফ সংকেত সেই চির সত্যটি উপস্থাপন করলেন। ধন্যবাদ হানিফ সংকেত। অভিনন্দন ‘ইত্যাদি’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here