একই জমি বন্ধক রেখে প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জামানত হিসেবে যেসব জমির দলিলাদি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হয় তা সঠিক কিনা তা যথাযথ ভাবে খতিয়ে দেখার জন্য একটি তথ্য ভান্ডার করা হচ্ছে। কোন গ্রাহকে ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলো এখান থেকে তথ্য যাচাই করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হলে একজন গ্রাহককে জামানত রাখতে হয়। জামানত হিসেবে মূলত ঋণ গ্রাহককে নিজের জমিকেই ব্যাংকের কাছে গচ্ছিত রাখতে হয়। জামানত ছাড়া কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় না। কিন্তু এই জামানত নিয়েই ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও অনিয়ম ঘটে থাকে। এ ধরনের প্রতারণা ও দুর্নীতি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি তথ্য ভা-ার গড়ে তোলা হচ্ছে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই তথ্য ভাণ্ডারটি আগামী বছরের মার্চের মধ্যে তৈরি করা হবে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋণের বিপরীতে জামানত সংক্রান্ত তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করার প্রয়োজন রয়েছে।

ব্যাংক ঋণের বিপরীতে জামানত সংক্রান্ত প্রতারণা ও দুর্নীতি রোধে একটি সামগ্রিক তথ্যভা-ার তৈরির অগ্রগতি জানতে চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক চিঠিতে এসব তথ্য জানিয়েছে বলে সূত্র জানায়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, জামানত তথ্য ভাণ্ডারের সফটওয়্যারটি চূড়ান্ত করার কাজ প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোলেটারাল ডাটাবেজের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার পাওয়া সাপেক্ষে সেটি উন্নয়নকৃত সফটওয়্যার সিস্টেমে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সিস্টেমটির পারফরম্যান্স টেস্টিং সম্পন্ন করা হবে। কোলেটারাল ইনফরমেশন সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার আগামী মাসে (সেপ্টেম্বর) সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি পাওয়া গেলে কোলেটারাল ইনফরমেশন সিস্টেমের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালুর আগে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ‘ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর’ (সিআইবি) আরো আনুমানিক ছয় মাস সময় প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এটি চালু হতে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় লাগবে।

এ ছাড়া ঋণ গ্রহীতার জামানত সংক্রান্ত তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর ৪৬ (১) ধারায় সিআইবি রিপোর্টের গোপনীয়তা এবং ৪৬ (২) (বি) ধারায় জনস্বার্থে সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যাংক কোম্পানি ও ঋণ গ্রহীতার নাম প্রকাশ ব্যতীত সিআইবি ডাটাবেজে রক্ষিত ঋণতথ্য প্রকাশের অধিকার শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ ছাড়া ৪৬ (৩) ধারায় অন্যান্য আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ছাড়া কোনো কোর্ট, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ সিআইবি ডাটাবেজে রক্ষিত ঋণতথ্য তৈরি বা অনুসন্ধান বা প্রকাশে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাধ্য করতে পারবে না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ৪২ (সি) (২) ধারা অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে গৃহীত জামানতের তথ্য সিআইবি ডাটাবেজে রক্ষিত ঋণতথ্যের আওতাভুক্ত হওয়ায় জামানতের তথ্যও ৪৬ (১) ধারা মতে গোপনীয়, যা একেবারেই ব্যক্তিপর্যায়ে প্রকাশযোগ্য নয় এবং ৪৫ (২) ধারা অনুযায়ী, কেবল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঋণ মঞ্জুরি ও জামানত গ্রহণ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার যোগ্য। সুতরাং ব্যাংক ঋণের বিপরীতে জামানতের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হলে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২’-এর সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সূত্র জানায়, এই তথ্যভা-ার গড়ে তোলা সম্ভব হলে ভুয়া দলিল বানিয়ে একই জমি দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে না। কারণ, এই তথ্যভা-ারে প্রবেশ্য করার ক্ষমতা সব ব্যাংকের কাছেই থাকবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো কোনো অসৎ গ্রাহক একই জমি বা ভূসম্পত্তি বিভিন্ন ব্যাংকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক ঋণের বিপরীতে জামানত সংক্রান্ত প্রতারণা ও দুর্নীতি রোধে ঋণ গ্রহীতার তথ্য সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘সেন্ট্রাল কেওয়াইসি’ বা ‘ইলেকট্রনিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ম্যানেজমেন্ট’ (ই-বিএএম) প্রতিষ্ঠা করা হবে। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে জমি বা ভূসম্পত্তি ব্যবহারে জালিয়াতি প্রতিরোধে জামানত গ্রহণে নীতিমালা প্রণয়নসহ এ সংক্রান্ত একটি কেন্দ্রীয় তথ্য কোষ গঠনের সুপারিশ করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here