ডেস্ক রিপাের্ট: ডুমনি, বোয়ালিয়া ও এডি-৮। রাজধানীর পূর্বাংশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি খাল। এগুলো দিয়ে একসময় বিমানবন্দর, নিকুঞ্জ, বারিধারাসহ আশপাশের এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতো। কিন্তু তিনটি খালই প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। এখন এসব খাল সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পাশাপাশি চওড়া করা হবে ৩০০ ফুট সড়ক। এ ছাড়া সড়কের দুই পাশের ১০০ ফুট খালকে কেন্দ্র করে আরও কিছু উন্নয়নকাজ করবে সংস্থাটি। এতে ৩০০ ফুট সড়ক ও আশপাশের এলাকার পুরো চিত্রই বদলে যাবে।
৪ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আবাসন প্রকল্পের বাইরে এটিই রাজউকের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প। এটি মূলত ২০১৫ সালে পাস হওয়া ‘কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে (কুড়িল থেকে বালু নদ পর্যন্ত) ১০০ ফুট চওড়া খাল খনন ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের সংশোধিত রূপ। ২০১৫ সালে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫ হাজার ২৮৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর সঙ্গে আরও তিনটি খাল, সড়ক, সেতুসহ আনুষঙ্গিক বিষয় যুক্ত হওয়ায় সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার ৪২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের মূল প্রকল্পে কুড়িল-পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের দুই পাশে ১০০ ফুট করে খাল খনন করতে ৯০ দশমিক ১৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে করা এই অধিগ্রহণ বাবদ খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয় হয় ২০৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অধিগ্রহণ শেষে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ১০০ ফুট খালের খননকাজ শুরু হয়। রাজউকের গত আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এর আগেই প্রকল্পটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী, আরও ৫৫ দশমিক ১ একর জমি নতুন করে অধিগ্রহণ করতে হবে। নতুন জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে আরও ১ হাজার ৪৪২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ বাবদ আরও দিতে হবে ৫২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সংশোধনী অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পে মোট অধিগ্রহণ করা জমি হবে ১৪৫ দশমিক ২৫ একর। ১০ হাজার ৩২৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রকল্পের মধ্যে অধিগ্রহণে খরচ হবে মোট ৫ হাজার ৬১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর ক্ষতিপূরণে মোট ব্যয় হবে ৭৩৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

প্রকল্পে যুক্ত তিন খাল
সংশোধিত প্রকল্পে তিনটি খাল যুক্ত করা সম্পর্কে রাজউকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে নিকুঞ্জ, বারিধারা, বারিধারা ডিওএইচএস, জোয়ারসাহারা, সেনানিবাস, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কালাচাঁদপুর, কাওলা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ১০০ ফুট খালটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে শুধু ১০০ ফুট খাল দিয়ে বিশাল এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। তাই প্রকল্পের সঙ্গে নতুন করে ডুমনি, বোয়ালিয়া ও এডি-৮ খাল তিনটি যুক্ত করা হয়েছে।
রাজউক জানায়, হোটেল লা মেরিডিয়ানের পেছনের এডি-৮ খালের সঙ্গে যুক্ত বোয়ালিয়া খাল। খাল দুটির বড় অংশ ভরাট হয়ে গেছে। নতুন করে খাল দুটি খনন করা হবে। খননের পর বোয়ালিয়া খালের সঙ্গে যুক্ত হবে ১০০ ফুট খাল। খননের পর এডি-৮ খালের দৈর্ঘ্য হবে ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার এবং বোয়ালিয়া খালের দৈর্ঘ্য হবে ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার। দুটি খালেরই প্রস্থ হবে ১০০ ফুট করে। এই দুই খালের পানি ১০০ ফুট খাল হয়ে বালু নদে গিয়ে পড়বে। এ ছাড়া ডুমনি এলাকার ডুমনি খালটিও সংস্কার করা হবে। এই খালটিও প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। খননের পর এই খালেরও প্রস্থ হবে ১০০ ফুট, দৈর্ঘ্য হবে ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এই খালটি পাশের কাঁঠালিয়া খালের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে ডুমনি খালের পানিও বালু নদ পর্যন্ত যাবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খাল তিনটি খননের পাশাপাশি পাড় বাঁধাইসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা হবে। এসব কাজ শেষ হলে নিকুঞ্জ-১, নিকুঞ্জ-২, জোয়ারসাহারা, সেনানিবাস, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কালাচাঁদপুর, কাওলা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আর জলাবদ্ধতা হবে না।

আট লেনের এক্সপ্রেসওয়ে
সংশোধিত প্রকল্পে ৩০০ ফুট সড়ক আরও প্রশস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সংশোধিত প্রকল্পে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন কুড়িল থেকে বালু নদ পর্যন্ত উভয় পাশে দুই লেন করে মোট চার লেনের সড়ক আছে। প্রতি লেনের প্রস্থ সাড়ে তিন মিটার। লেনের প্রস্থ একই রেখে কুড়িল থেকে বালু নদ পর্যন্ত চার লেনের সড়কটি আট লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা হবে। এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে দুটি করে সার্ভিস লেনও থাকবে। এ ছাড়া বালু নদ থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচলের জন্য ১০টি বড় সেতু নির্মাণ করা হবে (২০১৫ সালের মূল প্রকল্প সেতু ছিল ৬টি)। সেতুগুলো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া হাতিরঝিলের আদলে ১৩টি আর্চ ব্রিজ (বাঁকানো সেতু) নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ২২৭ কোটি টাকা। এক্সপ্রেসওয়ের পাশের এলাকার লোকজন যাতে গাড়ি নিয়ে সার্ভিস লেন থেকে মূল সড়কে ঢুকতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া পাতালপথ থাকবে চারটি।

আরও যা থাকছে
প্রকল্প এলাকায় চার কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের লাইন, ২টি কালভার্ট, ১২টি ওয়াটার বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের মূল প্রকল্পে উল্লেখ থাকা পদচারী-সেতুর সংখ্যা ৪টি থেকে বাড়িয়ে ১২টি, পাম্পহাউস ১টি থেকে বাড়িয়ে ৫টি, স্লুইসগেট ৪টি থেকে বাড়িয়ে ১০টি করা হয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আগামী মার্চের মধ্যে ১০০ ফুট খাল উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। বাকি কাজ ২০২১ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিমানবন্দর থেকে পূর্বাংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে না। কুড়িল থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই লোকজন যাতায়াত করতে পারবেন। এতে ওই এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here