
পরপর কয়েকটি দূর্ঘটনায় মেট্রোরেলের নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ব্যবহারকারী লাখো যাত্রী কিছুটা আতংক নিয়ে ভ্রমণ করছেন। জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ এই বাহনটি ব্যবহার করছেন। উত্তরা থেকে মতিঝিল আসা যাওয়ায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি পয়েন্ট যুক্ত এই পরিসেবা। মেট্রোরেল রাজধানীবাসীর চলাচলে যে সাচ্ছন্দ্য এনেছে তাকে বলা যায় আশীর্বাদ। ৩ দফায় কিছু সময়ের জন্য মেট্রো চলাচল বন্ধ হলে ভোগান্তির দুর্বিষহ চিত্রটি দেখা গেছে।
২০২৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের ৪৩০ নম্বর পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে ঐ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। ঐ দিনের ঘটনায় ট্রেন চলাচল ১১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। সম্প্রতি ২৬ অক্টোবর ফার্মগেটের ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। বিয়ারিং প্যাডটি ফুটপাতের ওপর আবুল কালাম নামে এক পথচারীর মাথার ওপর পড়ে। ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন আরো দু’জন। গত ২৯ অক্টোবর বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়া অংশে ট্রেনে কম্পন দেখা দিলে রাতে চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।
১৩ মাসের মধ্যে একই জায়গায় দুবার বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা চিন্তিত করে তুলেছে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের। ঐ জায়গায় কোন ত্রুটি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারনা নকশা, নির্মাণ অথবা বিয়ারিং প্যাডের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রাসঙ্গিক যে কোনো বিষয়ে ত্রুটি রয়েছে। কারণ চিহ্নিত করে এর সমাধান করা প্রয়োজন । যে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা ত্রুটি রেখে মেট্রোরেল পরিচালনা করা যৌক্তিক হবে না।
শুরু থেকেই মেট্রোরেলের চলাচলের পথ ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়নি। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মেট্রোরেলের উন্নয়ন ব্যয়ে বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। আবার চলতি অর্থবছরের জন্য পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ কমানো হয়েছে। প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার অতি জনগুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পটির অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে পরিচালনার জন্য এক টাকাও বরাদ্দ না রাখাকে অদক্ষতা ও অযোগ্যতা হিসেবে দেখছেন যোগাযোগ ও প্রকৌশল খাত বিশেষজ্ঞরা।
সড়ক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে কোন নিরাপত্তাঝুঁকি অস্বাভাবিক। এসব দুর্ঘটনা মেট্রোরেলে নিরাপদে যাত্রা বা জনবহুল শহরের পথচারী চলাচলে মানুষের মনে ভীতি জন্মাবে। মেট্রোরেলের নকশায় কোনো ত্রুটি আছে কিনা বা বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান ঠিক আছে কিনা, তা তদন্ত করা জরুরি। আর যদি কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়, তাহলে ব্যবস্থা নিতে হবে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। পরে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে পুরো প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এত ব্যয়বহুল ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বারবার ত্রুটিতে উদ্বিগ্ন ব্যবহারকারী ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সময় নিয়ে ধাপে ধাপে এর ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা দরকার। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় করে মেট্রোরেলকে নিরাপদ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক : মাঈনুদ্দীন দুলাল, সাংবাদিক
বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউবিডি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)





