
বাহ্যিক চাকচিক্য আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরামের চাদরে মোড়ানো দূরপাল্লার স্লিপার বাসগুলো এখন রূপ নিয়েছে জীবন্ত কফিনে। কাগজে-কলমে নামমাত্র রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর এক অনিয়মের জাল। কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন বা প্রকৌশলগত ছাড়পত্র ছাড়াই দেশের পরিবহন সেক্টরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত ভ্রাম্যমাণ মৃত্যুফাঁদ।
গত শুক্রবারের ভোরে সিলেট ও বগুড়ার মহাসড়কে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুটি রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা এই অব্যবস্থাপনারই ভয়ংকর পরিণতি। বিশেষ করে সিলেটের ওসমানীনগরে দুটি দূরপাল্লার বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝরে গেছে ৯টি তাজা প্রাণ, আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ভারসাম্যহীন কাঠামোর কারণে এই বাসগুলো চালকদের চোখের পলকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।
সড়ক সুরক্ষায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং প্রভাবশালী বাস সিন্ডিকেটের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে চলছে এই অবৈধ বাণিজ্য। অথচ আইনি মারপ্যাঁচ আর রিটের জাঁতাকলে আটকে আছে এসব ঘাতক যানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। আদালতে বিআরটিএ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সময়ক্ষেপণের নিত্যনতুন বাহানা খুঁজলেও সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে পিচঢালা পথ।
আমদানিকৃত সাধারণ চেসিসের ওপর নিজেদের ইচ্ছেমতো কাঠামোগত পরিবর্তন এনে তৈরি হচ্ছে এসব দোতলা স্লিপার বাস। যেখানে একটি নির্দিষ্ট ওজনের কাঠামোর ওপর কেবল নির্দিষ্ট সংখ্যক সাধারণ আসন বসানোর কথা, সেখানে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মালিকরা তৈরি করছেন স্লিপার বার্থ বা শোবার ব্যবস্থা। রাজধানী ঢাকার অদূরে গাবতলী, মিরপুর ও আমিনবাজারের খোলামেলা গ্যারেজগুলোতে প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ।
অথচ পরিবহন মালিক সমিতি কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ—কাউকেই এই দায় থেকে ছাড় দেওয়া চলে না। চেসিস আমদানির পূর্বেই উৎকোচ আর তদ্বিরের মাধ্যমে ভুয়া অনুমোদন ম্যানেজ করার অভিযোগ পুরোনো। ফলে সুরক্ষার সমস্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে হাইওয়েতে দাপিয়ে বেড়ানো এসব ঘাতক বাস থামানোর যেন কেউ নেই। বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে নড়েচড়ে বসে না রাষ্ট্রযন্ত্র, আর এরই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের প্রাণ দিয়ে।








