
কলম্বিয়ার ভূমিকম্পে আহত ও প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে বিভিন্ন শহরের ধসে পড়া অবকাঠামোর নিচে এখনো বহু মানুষ আটকে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বহু গুণ বাড়ার তীব্র আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন। ছাড়াও বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় গণমাধ্যম ও একাধিক উদ্ধারকারী সংস্থা।
গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে পুরো দেশকে কেঁপে তুলে আঘাত হানে ৭.৪ মাত্রার এই বিনাশী ভূমিকম্পটি। দেশটির ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার কাছে। এটি ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৩ কিলোমিটার গভীরে সংগঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কম্পনটির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে তা কেবল কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাতেই নয়, বরং সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ইকুয়েডর, পানামা এবং দূরবর্তী ভেনিজুয়েলাতেও ভীষণভাবে অনুভূত হয়েছে। মূল শক্তিশালী কম্পনটির পর অন্তত ডজনখানেক আফটারশক বা অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। পরপর একাধিক আফটারশকের ফলে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশের শত শত ঐতিহাসিক ও আবাসিক ভবন ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।
কলম্বিয়ার ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি ও আঞ্চলিক প্রাণহানি
দেশটির কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত রিসারালদা প্রদেশের রাজধানী পেরেইরা শহরে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই শহরটির পাশাপাশি আশপাশের এলাকা এবং ভালে দেল কাউকা অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি রেকর্ড করা হয়েছে। একমাত্র মানিজালেস শহরেরই একটি সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রালের মিনারসহ প্রায় ১,৬০০টিরও বেশি স্থাপনা আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
আরো পড়ুন : ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে লাখো মুসলিম, বেশির ভাগই বাংলাদেশ–ভারত–পাকিস্তানের
রয়টার্সের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পেরেইরা শহরের স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত অন্তত ৭২ জনের প্রাণহানির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী ভ্যালে দেল কাউকা অঞ্চলের কালির স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সেখানে নতুন করে ৩৮ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন। ভৌগোলিক উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছে থাকা চোকো নামক দুর্গম গ্রামীণ অঞ্চলে আরও ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর বাইরেও কালদাস অঞ্চলে দুজন এবং আন্তিওকিয়া অঞ্চলে ৭৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
উদ্ধার অভিযান, নিখোঁজদের আকুতি ও মানবিক পরিস্থিতি
সোমবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন নাগরিক সংস্থা ও স্থানীয় স্বজনদের পরিচালিত কয়েকটি উন্মুক্ত ওয়েবসাইটে ২,৭০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ বলে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই বিপুল নিখোঁজের সংখ্যা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। চোকো ও আশপাশের পার্বত্য এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনুসন্ধানকারী ও উদ্ধারকারী দলগুলোর সেখানে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য দিনরাত এক করে কাজ করছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় এবং ঘন ঘন আফটারশকের আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা তত কমে আসছে এবং চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা বর্তমান গণনার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও জরুরি অবস্থা
সোমবারের এই মহাবিপর্যয়মূলক ভূমিকম্প নবনির্বাচিত কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার প্রশাসনের জন্য এক বিশাল জাতীয় ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র গত শুক্রবারই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের তিনদিনের মাথায় এত বড় প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলা করা এখন নতুন সরকারের প্রধানতম পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
উদ্ভূত জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে এবং দুর্গত মানুষের কাছে খাদ্য, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বিশেষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট এসপ্রিয়েলা। একই সাথে জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক ত্রাণ সংস্থাকে দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছে কলম্বিয়া সরকার।
আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও স্থানীয় উদ্ধার তৎপরতা
ঘটনার পরপরই রেড ক্রস ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী টিমগুলো দুর্ঘটনাস্থলে অস্থায়ী চিকিৎসাক্যাম্প স্থাপন করেছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ায় তাদের সাময়িক আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন খোলা মাঠ ও স্টেডিয়ামে জরুরি তাঁবুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
স্থানীয় খাদ্য ব্যাঙ্ক ও সামাজিক সংগঠনগুলো দুর্গত মানুষদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ, তাই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অলৌকিকভাবে কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশায় তারা আধুনিক সেন্সর ও ট্র্যাকার ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা








