
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ইয়ার্ডের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১২ জন। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের সংঘর্ষে আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ইয়ার্ডটিতে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বিকেলে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী গ্যাস লিকেজ বন্ধে জাহাজ অভ্যন্তরে অভিযান চালালেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। সন্ধ্যার সোয়া ছয়টায় অভিযান শেষে সাংবাদিকের সাথে যৌথ ব্রিফকালে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা আল মামুন জানান, আমরা গ্যাস লিকেজের স্থান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। গ্যাসের প্রচণ্ড প্রেসারে আমরা ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি। তবে আমরা গ্যাসের একটি নমুনা নিতে পেরেছি। আপাতত ধারণা করা হচ্ছে এটি কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস।
তিনি আরো জানান, ঘটনাস্থলে আরো লাশ আছে কিনা নিশ্চিত হতে আমাদের ঘটনাস্থল পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যা আমাদের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। ঢাকার সাথে কথা বলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে শতাধিক পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়ন করা হয়েছে। সেখানে নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে স্থানীয় দুই সহোদর ভাইয়ের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন- ইয়ার্ড ইনচার্জ নাসির উদ্দীন (৫১), সেফটি ইনচার্জ আব্দুল আলিম সুজন (৩৫), ফোরম্যান মুনসুর আলী (৫৫), হাবিবুর রহমান (৫১) সানি জলদাস (২২) পলাশ জলদাস (২৭), রানা মিয়া (২৩) ও খোকন মিয়া (২৩) ও শরীফ (২৫)। নিহতরা সবাই স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে মুনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন সহোদর ভাই।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক অধিদফতরের চট্টগ্রামের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ তালুকদার বলেন, পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে এই দুর্ঘটনা ঘটে। গ্যাস ও ধোঁয়া ইয়ার্ডের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, ফেরদৌস স্টিলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি ছিল। কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। নিরাপত্তা ত্রুটি এবং বন্ধের দিনেও কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে এক মাস আগে তিনি বাদী হয়ে শ্রম আদালতে একটি মামলাও দায়ের করেছেন।
তবে প্রতিষ্ঠানের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল, শুধু হাউসকিপিংয়ের কাজ চলছিল। তবে বন্ধের দিনে ইয়ার্ড ইনচার্জ, সেফটি ইনচার্জ ও ফোরম্যান কেন সেখানে ছিলেন এ প্রশ্নের কোনো সদোত্তর দিতে পারেননি তিনি।
উদ্ধারকারীরা ও স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, ইয়ার্ডে ২৫ জন শ্রমিক কর্মচারী কাজ করছিল। যাদের উপস্থিতির বিষয়ে হাজিরা খাতায় উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মানিক নামে এক ব্যক্তি জানান, ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও ইয়ার্ডের মালিক ঘটনাটি গোপন রেখেছেন। একজন আহত ব্যক্তি ঘটনাস্থল জাহাজ থেকে গেট পর্যন্ত এসে ধুঁকে ধুঁকে আধাঘণ্টা পর মারা গিয়েছেন। পরে গেট দিয়ে একটি গাড়ি বের হয়ে যেতে স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পারে।
মানিক জানান, আমরা ঘটনাস্থল থেকে সাত জনের লাশ উদ্ধার করেছি। যাদেরকে আহত বলে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফখরুল ইসলাম ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জাহাজ কাটিং এর সময় কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গ্যাস লিকেজ বন্ধে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিবুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি এ মুহূর্তে কোন নিখোঁজের খবর নেই। তবে এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।








