
রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণহীন নগর পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি করেছে। অলিগলি ও অভ্যন্তরীণ সড়কের জন্য উপযোগী এসব স্বল্পগতির যান এখন রাজধানীর ব্যস্ত প্রধান সড়কেও উঠে আসছে। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, বিপরীতমুখী চলাচল, ট্রাফিক সংকেত অমান্য এবং নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচলের কারণে যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। অথচ এসব যান নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে বিদ্যমান আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি ই-রিকশাকে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট রুটের আওতায় আনার জন্য নতুন ব্যবস্থাপনাও এগোচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, সরকারের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত ও ইলেকট্রিক অটোরিকশা চলাচল না রাখার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ সড়কে নির্দিষ্ট শর্তে নিবন্ধিত ই-রিকশা চালানোর সুযোগ রাখা হচ্ছে। কোন যান কোন এলাকায় চলবে, তার জন্য রুট ও জোন নির্ধারণের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৫’ জারি করে। ২০২৬ সালে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন সংশোধনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় এসব যান নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থাও তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নীতির দিক থেকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার দিকে এগোনোর প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে সেটাই দেখার বিষয়।
সড়ক পরিবহণ আইনেই রয়েছে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ৩২ ধারায় জনস্বার্থে কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট শ্রেণির মোটরযানের চলাচল নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো যান চালক, যাত্রী বা অন্য সড়ক ব্যবহারকারীর জন্য বিপজ্জনক হলে সেটির চলাচল বন্ধ বা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আইনে রয়েছে।
আইনের ৩৩ ধারায় জনস্বার্থে কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট ধরনের মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। একই আইনের বিভিন্ন বিধানে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের যোগ্যতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অতএব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনগত শূন্যতা রয়েছে- এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। মূল সংকট আইন প্রয়োগ, নিবন্ধনব্যবস্থা, কারিগরি মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে।
আদালতের নির্দেশনাও ছিল, এরপরও সংকট কাটেনি
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপও হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট ঢাকা মহানগরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিল। পরে সরকারপক্ষ ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায় এবং চেম্বার আদালতের আদেশে হাইকোর্টের নির্দেশের কার্যকারিতা নিয়ে স্থিতাবস্থা তৈরি হয়।
তবে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশকে এসব যানবাহনের অবাধ ও স্থায়ী বৈধতার অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি যান বৈধভাবে সড়কে চলতে হলে তার নিবন্ধন, চালকের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় কারিগরি মান এবং সংশ্লিষ্ট রুটের অনুমতিসহ প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করতে হয়। ফলে আদালতের কার্যক্রম একদিকে এবং প্রশাসনিক অনুমোদন ও সড়ক ব্যবস্থাপনা অন্যদিকে, এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
নিবন্ধনহীন যান, অদক্ষ চালক- দায় নির্ধারণে জটিলতা
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ সরকারি নিবন্ধন তথ্য না থাকায় এসব সংখ্যার অনেকটাই অনুমাননির্ভর। এই তথ্যগত ঘাটতিই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা।
নিবন্ধনহীন যান দুর্ঘটনায় পড়লে মালিক, চালক এবং যানটির পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষতিপূরণ, বীমা, তদন্ত এবং ফৌজদারি দায় নির্ধারণেও জটিলতা দেখা দিতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স। ব্যস্ত মহানগরের সড়কে যাত্রী বহনকারী চালকের ট্রাফিক আইন, সংকেত, নিরাপদ গতি, লেন শৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। শুধু যানটির নিবন্ধন করলেই নিরাপদ পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে না; চালককেও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাজধানীর নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে সমস্যাটিকে কেবল উচ্ছেদ বা নিষেধাজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখলে বাস্তব পরিবহণ চাহিদার বিষয়টি উপেক্ষিত হতে পারে। আবার জননিরাপত্তার প্রশ্নে সম্পূর্ণ অবাধ চলাচলও গ্রহণযোগ্য নয়।
আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে একটি কার্যকর কাঠামোর জন্য প্রতিটি অনুমোদিত ই-রিকশার নিবন্ধন, নম্বর প্লেট ও পরিচিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি যানটির ব্রেক, স্টিয়ারিং, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে।
একই সঙ্গে কোন সড়কে ই-রিকশা চলবে এবং কোন সড়কে চলবে না- তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করে পরে তা বাস্তবায়নে শিথিলতা দেখালে সংকট আরও বাড়বে। নিয়মিত অভিযান, ডিজিটাল নিবন্ধন, রুটভিত্তিক অনুমোদন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার একসঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজধানীর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সমস্যা এখন শুধু ট্রাফিক পুলিশের বিষয় নয়। এটি সড়ক নিরাপত্তা, নগর পরিবহণ, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, চালকের কর্মসংস্থান এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক বিষয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈধ ও অবৈধ যানকে পৃথক করা, নিবন্ধনযোগ্য যানকে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ যান চলাচল কার্যকরভাবে বন্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অবৈধভাবে যান তৈরি, বিক্রি বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়াতে হবে।
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তাই শুধু অটোরিকশা আটক নয়; প্রয়োজন নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, কারিগরি পরীক্ষা, নির্দিষ্ট রুট, ডিজিটাল শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত আইন প্রয়োগের সমন্বিত ব্যবস্থা। আইন ও নীতিমালা ইতোমধ্যে যে কাঠামো তৈরি করেছে, সেটির কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ##







