,

দিপু পোড়েনি, পুড়ছে মানবতা

নিউজ ডেস্ক

টের পাচ্ছ কি?

আগুনের হল্কা।

দগ্ধ লাশের গন্ধ?

মানুষ পুড়ছে না, পুড়ছে সভ্যতা।

এতদিন ধরে গড়ে তোলা,

মানবিক দেয়াল ধসে পড়ছে।

মানুষ খুব কাঁদছে।

মানুষের পাশে মানুষ কই? “

কবিতার এই লাইন গুলো মনে আসল সাম্প্রতিক এক নৃশংস ঘটনা নিয়ে। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামের এক গার্মেন্টস কর্মীকে পিটুনি দিয়ে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ধর্ম অবমাননা করেছেন।

নিহত ব্যক্তি যদি ফেসবুকে কিছু লিখতেন তাহলেও একটা বিষয় হতো। সেখানে সবাই এখন বলছেন তারা তাকে (নিহত শ্রমিক) এমন কিছু বলতে নিজেরা শোনেননি। কেউ নিজে শুনেছেন বা দেখেছেন (ধর্ম অবমাননার বিষয়ে) এমন কাউকে পাওয়া যায়নি বলে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ময়মনসিংহ র‍্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান।

তিনি জানিয়েছেন, “পরিস্থিতি যখন টালমাটাল হয়ে ওঠে তখন ফ্যাক্টরি রক্ষায় তাকে বাইরে ঠেলে দেয়া হয়েছে”।

আমাদের প্রচলিত আইনে, দন্ডবিধির ২৯৫ ও ২৯৮ ধারা অনুযায়ী ধর্ম অবমাননার জন্য শাস্তি হচ্ছে ২ বছরের কারাদন্ড বা জরিমানা বা উভয় দন্ড।

মব দানবের ভাষায় দিপু ধর্ম অপমান করেছেন। তহলেতো তার জন্য দেশের প্রচলিত আইন ছিল। যদিও প্রমাণ করা যায়নি তিনি ধর্ম অপমানকর কোন কাজ করেছেন।

বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদন ও স্থানীয় সংবাদিকদের মাধ্যমে আমারা জানতে পেরেছি, দিপুকে তার কর্মদক্ষতার জন্য লাইন সুপারভাইজার হিসেবে প্রমোশন দেয়া হয়। এই পদের জন্যে স্থানীয় আরো দুজন প্রার্থী ছিলেন। এই নিয়ে বিবাদ ছিল। তাদের সাথে ঘটনার দিন কারখানার ভেতর বিবাদ হয়। এর পরপরই কে বা কারা রটনা ছড়িয়ে মব তৈরি করে দিপুকে কারখানা থেকে বের করে গণপিটুনী দেয়। আহত দিপুকে সড়কে এনে প্রকাশ্যে গাছে ঝুলিয়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।

মধ্যযুগে ইউরোপ যখন অন্ধকারে তখন এধরণের নৃশংস শাস্তি দিত কথিত ধর্মগুরুরা।

ইউরোপের অন্ধকার যুগে ধর্মীয় গোঁড়ামি, ডাইনি শিকার, নারী, দূর্বল মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় অপরাধের শাস্তি হিসেবে বহুল প্রচলিত একটি ভয়াবহ পদ্ধতি ছিল আগুনে পুড়িয়ে হত্যা।যেখানে মানুষকে জনসম্মুখে কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ দিয়ে খুঁটিতে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত, যা ছিল চরম নৃশংসতার প্রতীক। রেঁনেসা পরবর্তী ও আলোকিত ইউরোপের অনেক দেশে এখন মৃত্যুর দন্ডের শাস্তি বাতিল করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দিপুর ভাই অপু চন্দ্র দাস অজ্ঞাতনামা ১৫০ জনকে আসামী করে মামলা করেছেন। এর মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আমরা এই নৃশংস ঘটনার হোতাদের সর্ব্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করি। দিপুর পরিবার অকুল পাথারে ভেসে যাবে। তার স্ত্রী ও দেড় বছরের ছোট শিশুটির সামনের দিনগুলো অনিশ্চিত হয়ে গেল। রাষ্ট্র তাদের শারীরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেবে এটাও প্রত্যাশা।

নিষ্ঠুর এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ভাবে আমাদের ভাবমূর্তি কি ভীষণ রকম ক্ষতি করেছে তা ভাবাই যায় না। দুমড়েমুচড়ে গেছে আমাদের মানবতা। ভগ্ন হৃদয়ে কান্নাও আসেনা।

“এই নৃশংসতায় কান্নাও খুব কম মনে হয়”।

লেখক : মাঈনুদ্দীন দুলাল, সাংবাদিক

বি.দ্র.- (এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউবিডি২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন:

সাপ্তাহিক শিকড় সন্ধানে’র অনলাইন সংস্করণ

সম্পাদক ও প্রকাশক : মাসুম আহম্মেদ

সম্পাদকীয় কার্যালয়: সাপ্তাহিক শিকড় সন্ধানে, পশ্চিম মাতুয়াইল, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১৩৬২ থেকে প্রকাশিত এবং তুহিন প্রেস, ফকিরের পুল, মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ।
মুঠোফোন : ০১৯৫০-৫৫০৫৮৫, ০১৭৬৬৬১১০৪৪,
ই-মেইল : editorshikornews@gmail.com
web: www.shikorsandhane.com

Exit mobile version