,

বিলুপ্তির দেড়শ’ বছর পর আবারো নিজ আবাসে ফিরছে ‘এলিয়েন টরটোইজ’

শিকড় সন্ধানে ডেস্ক

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ বছর আগে গ্যালাপাগোসে পৌঁছেছিল এসব কচ্ছপ। এক বছর পর্যন্ত খাবার ও পানি ছাড়া বেঁচে থাকার ক্ষমতাই তাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জলদস্যু ও তিমি শিকারিরা জাহাজে করে শত শত কচ্ছপ নিয়ে যেত, যাতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় এ কচ্ছপগুলোকে তারা খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে একসময় ছিল লাখো বিশালাকার কচ্ছপ। কিন্তু জলদস্যু ও তিমি শিকারিদের কারণে মাত্র দুই শতকে ১ থেকে ২ লাখ কচ্ছপ হারিয়ে যায়। উনিশ শতকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ফ্লোরিয়ানা প্রজাতির কিছু কচ্ছপের বংশধর আবার সেই দ্বীপে ফিরছে। এ ফিরে আসার গল্পে আছে মানুষের তৈরি বিপর্যয়, বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণা আর প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের এক ধৈর্যের পরীক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ বছর আগে গ্যালাপাগোসে পৌঁছেছিল এসব কচ্ছপ। এক বছর পর্যন্ত খাবার ও পানি ছাড়া বেঁচে থাকার ক্ষমতাই তাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জলদস্যু ও তিমি শিকারিরা জাহাজে করে শত শত কচ্ছপ নিয়ে যেত, যাতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় এ কচ্ছপগুলোকে তারা খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

দ্বীপভেদে কচ্ছপের আলাদা প্রজাতি তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮৫০ সালের দিকে সবার আগে বিলুপ্ত হয় ফ্লোরিয়ানা কচ্ছপ, যার খোলস ছিল বিশেষ ধরনের জিন আকৃতির।

তবে গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। ২০০০ সালে গবেষক জেমস গিবসের নেতৃত্বে এক অভিযাত্রী দল আইসাবেলা দ্বীপের উলফ আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে এক অদ্ভুত চেহারার কচ্ছপের দেখা পায়। স্থানীয় প্রজাতির মাঝে এমন জিন আকৃতির পিঠের কচ্ছপ দেখে তাজ্জব বনে যান তারা। প্রাথমিক জিনগত পরীক্ষায় ভিন্নতা মেলায় বিজ্ঞানীরা রসিকতা করে এগুলোর নাম দেন ‘এলিয়েন টরটোইজ’ বা ভিনগ্রহী কচ্ছপ। ৪ বছর পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এগুলো আসলে বিলুপ্ত ভেবে নেয়া ফ্লোরিয়ানা বংশের কচ্ছপ। কিন্তু দেড়শ বছর পর কীভাবে এগুলো এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে এল? ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত ওজনের কারণে তিমি শিকারিরা সমুদ্রযাত্রার আগে হয়তো এগুলোকে উপকূলে ফেলে গিয়েছিল।

এরপর শুরু হয় এদের ফিরিয়ে আনার বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১৯৬৫ সাল থেকে কাজ করা ফাউস্তো লেরেনা প্রজনন কেন্দ্রে প্রথমে ১৯টি কচ্ছপ এনে শুরু হয় লালন-পালন। পার্ক রেঞ্জার ফ্রেডি ভিল্যালবা জানান, ডিম ফুটানোর তাপমাত্রা দিয়েই ঠিক করা হয় লিঙ্গ। ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুরুষ এবং ২৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্ত্রী কচ্ছপ জন্মায়। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর এক মাস এরা কেবল কুসুম খেয়ে বাঁচে। পরে দু বছর এলিফ্যান্ট ইয়ার্স পাতা খাইয়ে বড় করা হয়। ওয়াল্টার চিম্বোরাজোর মতো কর্মীরা স্নেহে আগলে রাখেন এই খুদে কচ্ছপগুলোকে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৫৮টি কচ্ছপকে ফ্লোরিয়ানায় ছেড়ে দেয়া হয়। নাসার সহায়তায় উপযুক্ত এলাকা বেছে নিয়ে তাদের শরীরে উপগ্রহ-নির্ভর নজরদারি যন্ত্র বসানো হয়। এগুলো মূলত উলফ আগ্নেয়গিরিতে পাওয়া বংশধর। বন্দিদশায় তারা দ্রুত বংশবিস্তার করেছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি বাচ্চা জন্মেছে; বছরে গড়ে আরো ৬০টি জন্মাচ্ছে।

তবে সদ্য ছেড়ে দেয়া কচ্ছপগুলো পুরোপুরি ফ্লোরিয়ানা প্রজাতির নয়। তাদের জিনে ফ্লোরিয়ানা ও উলফ আগ্নেয়গিরির স্থানীয় প্রজাতির মিশ্রণ রয়েছে। এখনো বিশুদ্ধ ফ্লোরিয়ানা কচ্ছপ পাওয়া যায়নি। তবে ৫০ শতাংশ ফ্লোরিয়ানা বৈশিষ্ট্যের কিছু তরুণ কচ্ছপ পাওয়া গেছে, যা থেকে বিশুদ্ধ ফ্লোরিয়ানার অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব কচ্ছপ স্বাভাবিকভাবে সাধারণত ১০০ বছরের বেশি বাঁচতে পারে।

এই প্রাণীগুলো শুধু কচ্ছপ নয়, গ্যালাপাগোসের বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। একটি বিশাল কচ্ছপ বছরে ২২৫ কেজি পর্যন্ত উদ্ভিদ খায়। আর এদের খাবার হজম হয়ে বীজ ছড়িয়ে পড়তে প্রায় এক মাস লাগে। তত দিনে তারা বহু কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। কিছু উদ্ভিদের বীজ কচ্ছপের পরিপাকতন্ত্র অতিক্রম না করলে ভালোভাবে অঙ্কুরিতও হয় না। ৪০০ কেজি ওজনের কচ্ছপ আবার গাছপালা সরিয়ে মাটি খুঁড়ে অন্য প্রাণীর জন্য জায়গা তৈরি করে।

মানুষের আনা ছাগল, শূকর ও গাধার মতো আক্রমণাত্মক প্রাণী নির্মূল করা হয়েছে। ইঁদুর ও বিড়াল নিয়ন্ত্রণেও কাজ চলছে। গ্যালাপাগোসে স্থলচর পাখির প্রায় ৮০ শতাংশ, সরীসৃপ ও স্থলচর স্তন্যপায়ীর ৯৭ শতাংশ, উদ্ভিদের ৩০ শতাংশের বেশি এবং সামুদ্রিক প্রাণীর ২০ শতাংশের বেশি স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়। ইকুয়েডরের উপকূল থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরের এ দ্বীপগুলোর বিচ্ছিন্ন অবস্থানই এ বৈচিত্র্যের বড় কারণ। তবে খরা, পানির সংকট, লবণাক্ততা ও অতিবেগুনি রশ্মিও এসব প্রাণীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যপ্রাণীর কাছ থেকে দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম রয়েছে।

গত ৬০ বছরে সরকার, বেসরকারি সংগঠন ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৯ হাজারের বেশি বিশালাকার কচ্ছপ প্রজনন করে বনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যদিও সম্পূর্ণ প্রজাতি পুনরুদ্ধারে সময় লাগছে। ধীরগতির হলেও কচ্ছপের মতোই এ প্রচেষ্টা স্থির ও অবিচল। একসময় মানুষের তৈরি সমস্যার শিকার হওয়া প্রাণীরাই এখন সেই ক্ষতি পূরণে প্রকৃতিকে আবার এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে।

শেয়ার করুন:

সাপ্তাহিক শিকড় সন্ধানে’র সহযোগী প্রতিষ্ঠান

সম্পাদক  : মাসুম আহম্মেদ

যোগাযোগ :
Email : editorshikornews@gmail.com
Web : www.shikorsandhane.com

©২০২৬ শিকড়সন্ধানেডটকম কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত | ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট : Kolpotoru IT.
Exit mobile version