নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে মহাবিপদে পড়েছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশা। যান্ত্রিক এই বাহনগুলোর আগ্রাসনে একদিকে যেমন হারাতে বসেছে শতবর্ষী রিকশা সংস্কৃতি, অন্যদিকে চরম রূপ নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা ও অবৈধ বিদ্যুৎ চুরির মতো অপরাধ। বিশ্বস্বীকৃত ‘রিকশা আর্ট’ আজ বিলুপ্তির মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই সঠিক ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা না হলে এই বহুমুখী সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
তেজগাঁওয়ের একসময়ের প্রভাবশালী গ্যারেজ মালিক মো. মঞ্জুর এখন নিঃস্ব। শতাধিক প্যাডেল রিকশার মালিক থেকে আজ তিনি কর্মহীন। চালকসংকট এবং যাত্রী খরায় গ্যারেজটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
আর্তনাদ করে মো. মঞ্জুর বলেন, ‘এই রিকশা অহন আমগোর গলার কাটা হইয়া দাঁড়াইছে। রিকশা চলে না, আমরাও দুইটা ডাল-ভাত খাইতে পারি না। এইডা নিয়া খুব চিন্তিত আছি আজ দুই-তিন বছর ধইরা। এই রাস্তার মধ্যে গাড়ি থুইয়া কী করমু? অবস্থা খুব খারাপ।’
শুধু মঞ্জুর একা নন, রাজধানীর প্রায় তিন হাজার গ্যারেজ মালিক তাদের ব্যবসা হারিয়ে পথের বসেছেন। বাধ্য হয়ে অনেকে ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশার গ্যারেজ রূপান্তর করেছেন অটোরিকশার আড্ডায়। এতে শত শত প্রকৃত রিকশাচালক হারিয়েছেন তাদের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। আর যারা এখনো প্যাডেল রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামছেন, তাদের জীবন প্রতিদিন এক ভয়ানক যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।
জামালপুরের দুদু মিয়া প্রায় তিন দশক ধরে রাজধানীতে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। নিজের চোখের সামনেই তিনি দেখেছেন কীভাবে তার আয়ের পথটি দখল করে নিয়েছে অবৈধ বাহনগুলো।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে দুদু মিয়া জানান, ‘পোলাপানের লেখাপড়া করাইতে পারি না। খুব দুর্যোগ মোকাবিলা যাইতাছে দিন। অটোগাড়ি বানানির পরে আমগোর বাংলা গাড়িতে কোনো যাত্রী ওঠে না। কীভাবে সংসার চালাবো আর কীভাবে দিন যাইবো আমার? পোলাপান নিয়া কই যামু, কী করমু? কোনো দিশা পাই না।’
প্যাডেল রিকশার চাকা যত ধীরগতির হচ্ছে, ততই তলিয়ে যাচ্ছে এর সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের স্বপ্ন। আরেক প্রবীণ চালক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘না পারি ছেলেমেয়েরে লেখাপড়া শিখাইতে, না পারি আমরা চলতে। এই পরিস্থিতিতে আমরা দিন যাপন করতেছি।’
অটোরিকশার এই লাগামহীন বিস্তার কেবল অর্থনৈতিক টানাপোড়েনই তৈরি করছে না, বরং জনজীবনকে ফেলছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। এমনকি আমাদের লোকশিল্পের গর্ব, আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ‘রিকশা আর্ট’-এর অস্তিত্বও আজ বিপন্ন।
এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগের পরিচালক ড. তপন কুমার বাগচী বলেন, ‘এই যান্ত্রিক রিকশাগুলোকে যখন বাজারে-পথে ছাড়ার অনুমতি হলো, তারা তখন আর এই পেছনের আর্টটা, সেটি তাদের উপযুক্ত, মানে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না। কিন্তু রিকশাকেই বাঁচিয়ে রাখা উচিত। আর রিকশাকে বাঁচিয়ে রাখলে আমার পেইন্টিং বাঁচবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈজ্ঞানিক একটি বাহন গ্রাস করেছে পরিবেশবান্ধব প্রাচীন এক মাধ্যমকে, যা জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এই অটোরিকশা যেভাবে পঙ্গপালের মতো সড়কে নেমেছে, আমার ধারণা এখানে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে। তার সঙ্গে এই যে চুরি করে বিদ্যুৎ, সেখানে একটা বিশাল রাজস্ব এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে। এই ক্ষতিগুলো যদি আমরা বিবেচনায় নেই, জীবন-জীবিকার সঙ্গে আসলে অর্থনৈতিক ক্ষতি সেটা যদি আমি কস্ট-বেনিফিট এনালাইসিস করি, এটা আমি স্বল্পমেয়াদী এখান থেকে আমি একটা সুবিধা হয়তোবা দেখছি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এটা আমাদের একটা বিশাল আমি মনে করি মাথাব্যথা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। দেশে বৈধ বা প্যাডেল রিকশার সংখ্যা ১০ লাখের কাছাকাছি হলেও, তার বিপরীতে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬০ লাখ। নিরাপত্তার বালাইহীন এসব অবৈধ বাহন রাজধানীসহ সারা দেশের সড়কে কেবল বিশৃঙ্খলাই ছড়াচ্ছে না, বরং বাড়িয়ে তুলছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার হার।
