, ।
।

বৈশ্বিক সরকারি ঋণ ১০০ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা

শিকড় সন্ধানে ডেস্ক

বিশ্ব এমন এক ঋণের পাহাড়ের দিকে এগোচ্ছে, যা শতবর্ষ ধরে দেখা যায়নি। এই গতি অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যেই বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলতে পারে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার মঞ্চ থেকে এই সতর্কতা দিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের বোঝা, সুদ পরিশোধের ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটির সতর্কবার্তা, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে আর্থিক বাজারের চাপ সরকারগুলোকে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে সংস্থাটির প্রকাশিত ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে এমন সতর্কতা উঠে আসে।

এদিন আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস এ বিষয়ে বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়লেও অনেক দেশে তার যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। ঋণের উচ্চ মাত্রা, বাড়তি সুদহার এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

আইএমএফের ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে বলছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে তা জিডিপির ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণ বৃদ্ধি এ পরিস্থিতির অন্যতম চালক। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা, কৌশলগত স্বনির্ভরতা এবং অন্যান্য সরকারি খাতে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ায় সরকারের হাতে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সরকারি অর্থব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। জ্বালানির উচ্চ মূল্য মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করলে সুদহারও দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে। এতে সরকারগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে এবং বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। আর্থিক ঝুঁকি বেশি এমন দেশগুলোকে বাজারের চাপ বাড়ার আগেই বিশ্বাসযোগ্য ও পর্যায়ক্রমিক আর্থিক সমন্বয়ের পরিকল্পনা নিতে হবে বলে মনে করে আইএমএফ।

ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জর্জিয়েভা জানান, এসব দেশের ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগের রাজস্বের ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এর অর্থ সরকারগুলোকে সংগৃহীত রাজস্বের আরও বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে।

জর্জিয়েভা আরও বলেন, উন্নত অর্থনীতিগুলোর সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেও পড়ছে। বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদের বাজারে অর্থ সরিয়ে নিলে এসব দেশের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহায়তা কমে গেলে বাজেটের ঘাটতি পূরণ আরও কঠিন হয়।

এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও দুর্যোগজনিত ঋণ-স্বস্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে আইএমএফ সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা ট্রাস্ট (পিআরজিটি) এবং দুর্যোগকালীন ঋণ-স্বস্তি তহবিল (সিসিআরটি)। এ অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বাড়লেই দেশটির বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। বাজেট ঘাটতি কমানো এবং রাজস্ব ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সমন্বয় প্রয়োজন।

১৪ অক্টোবর ব্যাংককে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জর্জিয়েভা বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণের চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সমন্বয় যথেষ্ট দ্রুত নিশ্চিত করতে পারে না। তাই ঘাটতি কমানোর দিকে যেতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় অর্থনীতিগুলোর আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতিও আইএমএফের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। জর্জিয়েভা চীনকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রতিবেদন দাবি করা হয়, ঋণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু উন্নয়নশীল বা ঋণসংকটে থাকা দেশগুলোর নয়। বড় অর্থনীতিগুলোর উচ্চ ঋণ ও বাজেট ঘাটতিও আন্তর্জাতিক সুদহার, বিনিয়োগ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেন, সরকারি ঋণ বাড়ছে, সুদহার বেড়েছে এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বড় উন্নত অর্থনীতিগুলোর আর্থিক নীতিতে শৃঙ্খলার ঘাটতির প্রভাব শুধু তাদের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের মাধ্যমে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

ভালদেস বলেন, ছয় মাস আগের প্রত্যাশার তুলনায় চলতি বছরের আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে এবং এক বছর আগের তুলনায়ও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে†। তাঁর মতে, বৈশ্বিক ঋণ ও বন্ডবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আর্থিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে ঋণের চাপ কাটানো সম্ভব নয়। সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য উন্নত করতে হবে এবং যেসব খাতে ব্যয়ের কার্যকারিতা কম, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের জন্য করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপরও জোর দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির অক্টোবর ২০২৬-এর ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনের একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে, করের নকশা ও বাস্তবায়ন উন্নত করলে রাজস্ব ধরে রেখেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও করপোরেট করব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় বিকৃতি কমানো, কাজের প্রণোদনা উন্নত করা, উদ্ভাবনে সহায়তা আরও লক্ষ্যভিত্তিক করা এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

আইএমএফের এ দৃষ্টিভঙ্গি শুধু করের হার বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং করব্যবস্থায় ফাঁকফোকর কমানো, কর অব্যাহতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা, কর সংগ্রহের প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন। কোন খাতে ব্যয় বেশি ফল দিচ্ছে এবং কোথায় অর্থের অপচয় হচ্ছে, তা যাচাই করে বরাদ্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। তবে ব্যয় কমানোর নামে প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ সুদ, জ্বালানি ও সারের দাম এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একই সঙ্গে একাধিক সমস্যা তৈরি করছে। একদিকে ঋণ পরিশোধে অর্থ দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রশাসক আলেক্সান্ডার ডে ক্রু গণমাধ্যমকে বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যম পর্যায়ের দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় গড়ে তিন গুণ বেশি সুদ পরিশোধ করছে। তাঁর মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প তৈরিতে উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামলানো।এসব ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ নতুন আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। এ আলোচনায় রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে বৈশ্বিক বক্তব্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা চূড়ান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

আইএমএফের সামগ্রিক বার্তা হলো, ঋণ নেওয়া নিজেই সমস্যার সমাধান নয়; ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, রাজস্ব কীভাবে বাড়ছে এবং সরকারি ব্যয় কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে।এসবের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। বৈশ্বিক ঋণের চাপ বাড়ার এই সময়ে দেশগুলোর সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ: একদিকে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা।

এসএস/এমএ

শেয়ার করুন:

সাপ্তাহিক শিকড় সন্ধানে’র অনলাইন সংস্করণ

সম্পাদক  : মাসুম আহম্মেদ

যোগাযোগ :
Email : editorshikornews@gmail.com
Web : www.shikorsandhane.com

©২০২৬ শিকড়সন্ধানেডটকম কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত | ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট : Kolpotoru IT.